পায়ে হেঁটে দেশদেখা: রহস্যময় স্মৃতিগুলো

0 76

হেঁটে দেশদেখা: রহস্যময় স্মৃতিগুলো

জাহাঙ্গীর  আলম শোভন

পায়ে হেঁটে দেশভ্রমনের সময় বিভিন্নস্থানে নানা চমকপ্রদ ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে রহস্যময় বেশকিছু ঘটনাছিলো। সেগুলো শেয়ার করছি।  তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ যাওয়ার পথে অসংখ্য স্মৃতির মধ্য থেকে ৫টি ঘটনা বলছি।

(এক) অদৃশ্য হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট ও দৃশ্যমান আমি

১৪ ফ্রেব্রুয়ারী সন্ধ্যায় যখন পঞ্চগড় জেলা শহর থেকে বোদায় এসে থাকার জায়গা খুজতে ডাকবাংলোতে গেলাম। সেখান থেকে ফিরে আসার সময় আমাকে এক হোটেল মালিক ডাকলেন। তাকে ইশারা দিয়ে বললাম আসছি। আমার ইচ্ছা আগে থাকার জায়গা ঠিক করা হোক তারপর অন্য আলাপ। তো থাকার জায়গা ঠিক করে একটু রেস্ট নিয়ে ফিরে এলাম সে রাস্তায় যে রাস্তা দিয়ে সরকারী ডাকবাংলোতে গিয়েছিলাম। কমপক্ষে তিনবার রাউন্ড দিলাম কিন্তু সে দোকান আর দোকানী দুটোই যে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। সেই দোকানটার সাথে আর কোনো দোকানের সাথে মেলাতে পারলাম না, দোকানদারের চেহারার সাথেতো নয়ই। বার বার লোকজনকে জিজ্ঞেস করে দেখলাম সঠিক রাস্তা কিনা? নিজেও তাকিয়ে দেখি হ্যাঁ সবই ঠিক আছে। শুধু ঠিক নেই সেই দোকান আর দোকানী। ওদিকে বার বার চক্কর দিচ্ছি সেটা লাইভ ট্র্যাকে ঢাকায় বসে দেখছিলেন ছোটন ভাই। ভাবলেন কি ব্যাপার শোভন ভাইর কোনো সমস্যা হলো কিনা। তিনি ফোন দিয়ে জানতে চাইলেন কোনো সমস্যা হলো কিনা? আমি অতো কিছু না বলে শুধু বললাম, না ভাই একটু ঘুরে দেখছি আরকি। সে বাজার থেকে রুমে পরার জন্য এক জোড়া স্যান্ডেল কিনে নিলাম, যদিও ঢাকায় এগুলোর একটা কিভাবে যেন হারিয়ে যায়।  এজন্য হোটেলের নাম দিলাম অদৃশ্য হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট, এ ধরনের ব্যবসায়ের এরকম নামই হয় নাকি?

(দুই) ভরদপুরে পুরনো মন্দিরে

রামসাগর পারের গাছগাছালী ও বনবনানী খুব অনেক বেশী বিস্তৃত নয়। তবুও বনবিভাগ বদান্যতা করে এটা গ্রহণ করেছে। এখানে বনবিভাগের ছোট একটি বাংলো রয়েছে। কিন্তু বুকিং বা অবকাশ যাপনের সুযোগ বনবিভাগের কর্তারা ছাড়া আর কারো নেই। এখানকার অধিকারিক অন্তত তাই বললেন।  ১৮ ফ্রেব্রুয়ারীতে গিয়েছিলাম রামসাগরে।

পুরনো মন্দির । রামসাগরের উত্তর পাড়ে একটি পুরনো মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ পেলাম। কিন্তু দিক নির্দেশনা কিংবা কিতাবাদিতে এর কোনো বিবরণ পাইনি মনে হলো যেন এটা আমিই প্রথম আবিষ্কার করলাম। অথচ এর নির্মাণশৈলী নির্মাণ কাঠামো, মন্দিরগাত্রে শিলা, অলংকার, নকশা সকল বিবেচনায় একে একটি দেখার বা বুঝার এক কথায় প্রতœতাত্বিক স্থান বলে মনে হলো। অন্তত ছবি দেখেও তাই মনে হবে বৈকি?

আমি যখন এই মন্দির দেখতে গিয়েছি তখন ভরদুপুর। আশেপাশে লোকজন নেই। একা একা একটা পুরনো মন্দিরের ভেতরে ঢুকছি বের হচ্ছি। গা ছম ছম করছিেেলা। মন্দিরের তিনদিকেই গাছগাছালি আর জঙ্গল। এমনকি মন্দির গাত্র সংলগ্ন অসংখ্য বট অশ্বথ গাছ জড়িয়ে রয়েছে। একেবারের একশভাগ ভুতুড়ে পরিবেশ। দিনের বেলায় ভয় পাওয়ার মতো। কোনোদিকে একটু শব্দ হলে গা চমকে উঠে। কয়েক মিনিট এখানে ছবি টবি তুলেছি। তবে না তেমন বিশেষ কোনো ঘটনা ঘটেনি।

 

তিন: গুহাচিত্র

ভাবছেন তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ এই পথে গুহাচিত্র আবিষ্কার করলাম কোথায়। পথে একদিন ছিলাম দাউদকান্দি ডাকবাংলোতে। রাত ৮টা থেকে বসে আছি টিএনওএর উদ্দেশ্যে। তিনি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং এ আছেন। তারিখটা ৮ মার্চ। ঘন্টা খানেক বসার পর আমার আর সইলোনা। আমি সোজা বাংলোতে চলে গেলাম। কেয়ারটেকারকে জিজ্ঞেস করতে ‘‘জবাব দিলো, টাকা দিবেন, থাকবেন, অসুবিধা কি? তো আমার জন্য একটা রুম দেয়া হলো। রুমে ঢুকতেই ভ্যাঁপসা গন্ধ, দেয়ালে সব গুহাচিত্র। মানে পলেস্তারা উঠে এমন হয়েছে। যেন এক একটা চিত্র হাতি ঘোড়া আর খরগোশের মতো। বাথরুমে গিয়ে দেখি লাইট নেই। তবে পেছনের জানালা ভাঙ্গা, সেটা আবার একটু বড়ো এতে সুবিধা হলো পেছনের বাসা থেকে আলো আসে। কিন্তু আমি আরামে গোসল করতে পরছিনা। কিছুটা অস্বস্তি বোধ করছি। কারণ জানালাটা বড়ো আর ভাঙ্গা।

পরে দেখলাম অন্যকক্ষগুলো এমন নয়। কেয়ারটেকার হয়তো পয়সা পকেটে ঢোকানোর জন্য আমাকে এই কক্ষ দিয়েছে। কারণ কক্ষটি পরিত্যক্ত মনে হলো। যাই হোক আমার ধারণা ছিলো এটা ভুতুড়ে কক্ষ তাই এখানে কেউ থাকেনা। ভালোই হবে ভুতের সাথে একটা বোঝাপড়া আজ করা যাবে। কিন্তু রাতটা কেটে গেলো ভুত বাবাজির দেখা পাওয়া গেলনা।

(চার) চুনুতির ভুতুড়ে বাংলো

লোহাগড়া থানা আর চুনুতি পুলিশ ক্যাম্পে জানতে চাইলাম। রাস্তা নিরাপদ কিনা অন্তত রাতের জন্য। তারা অভয় দিলেন হাতি এখন আসবেনা যেহেতু পথে এখন উন্নয়ন কাজ চলছে। আর চুরি ছিনতাই আপাতত ভয় নাই। কিন্তু চুনুতি বাজারে স্থানীয় জনসাধারণ এক কথায় না করে দিলো। বনের মধ্যে রাতে যেকোনো সমস্যা হতে পারে। আশঙ্কা অমূলক নয়। আমিও আর ঝুকি না নিয়ে চুনুতি থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম। কোথায় থাকবো সেটা বুঝতে পারছিনা।  খোজ নিয়ে পেয়ে গেলাম চুনুতি ডাকবাংলা। রাস্তার একটু পাশে ছোট একটা পাহাড়ের উপরে। দুই রুমের বাংলো। খোঁজ নিয়ে কেয়ারটেকারকে পাওয়া গেলো। আমার নামে নাম। পাহাড়ে উঠে চাবি বুঝে নিলাম। কিন্তু সে চলে গেলো। বিদূতের মতিগতি মোটেই ভালো না। এই হাঁটার অভিজ্ঞতায় যেটা দেখলাম তা হলো ঢাকা ছাড়া কোথাও বিদ্যুতের অবস্থা ভালো নয়। কক্সবাজারের মতো পর্যটন এলাকায়তো নয়ই চট্টগ্রামের মতো বানিজ্যিক রাজধানীতেও নয়। এখানে অবস্থা একেবারেই বেগতিক। কারেন্ট আসা যাওয়া দেখে মনে ঝিল মিল ঝিলমিল বাতি লাগোনো হয়েছে।

পাশে পাহাড়ের একটু নিচে কেয়ারটেকারের বাসা। নি:সঙ্গতা আমি উপভোগ করি। এমন একটা জয়গায় একটা থাকবো । খুব এক্সাইটেড আমি ফেসবুকে বসে কারেন্ট থাকা ও না থাকার অস্থার দুটো ছবি তুললাম বাংলো ও বাংলোর মাঠের। দিলাম মজার ফেসবুকে।

 

থেকে অচেনা পাখি ডাকছিলো। রাতের আঁধারে এমন এক নির্জনস্থানে আছি। কিছুক্ষণ পর চাঁদ উঠলো। চারদিকে পাহাড়বন টিলার উপর দুইরুমের কামরা তার সমানে একটা মাঠ মাঠের চারপাশে গাছগাছালি। মাঠের মধ্যে একটি পাথরের উপর বসে চাঁদের আলো দেখছে দূরকোনো এলাকা থেকে আসা এক যুবক এই দৃশ্য অন্যরকম অন্যরকম অন্যরকম।

কিন্তু সারারাতেও কোনো ভুতের দেখা পাইনি। তবে একটা ঘটনা কিন্তু ঘটেছে। সন্ধ্যায় বাজার থেকে ডিনার করে আসার সময় একটা পানির বোতল নিয়ে আসলাম ২ লিটার। এটা দরজার কাছে রেখে দরজা খুললাম। পরে ভুলে গেছি। আর চোখেও পড়েনি। কারেন্ট ছিলো না বলে। কারেন্ট আসার পর পানি খাবো। আর বোতল খুঁজে পাইনা। পাইনা তো পাইনা। কোথাও নেই। ঘরের ভেতরে, বাইরে, বারান্দায়, খাটের নিচে। এরমধ্যে কোনো লোকও এখানে আসেনি। আসলে নিশ্চয় দেখতাম কারণ আমি বাইরে বসা ছিলাম। পরে বাধ্য হয়ে আরেক বোতল পানি আনলাম বাজারে গিয়ে। সকালে বের হবো গোছগাছ করে নিলাম। দেখি পানির বোতলটা দরজার পাশে কাত হয়ে পড়ে আছে। খুব অবাক হলাম কারণ কাল বিদ্যূৎ আসার পর অনেকবার এই জায়গাটাতে খুঁজেছিলাম। যাইহোক ওসব নিয়ে ভাবার সময় নেই। আর মাত্র কয়েকদিন হাঁটলেই আমার মিশন শেষ হবে আমি সে চিন্তায় অস্থির।

ভরা বোতল আর আধা বোতল মানে যেটা পরে বাজার থেকে এনে পানি খেয়েছিলাম, দুটো নিয়েই বের হলাম। ভাবলাম পথমে আধা বোতলের পানি খাওয়া যাক এটা শেষ হলে পরে ভরা বোতলটা খোলা যাবে।  সকাল থেকে বেলা ১০টা নাগাদ পানি খেলাম। খেয়ে খালি বোতল ফেলে দিলাম। এবার ভরা বোতল খুঁঝতে লাগলাম। সেটা আর পাইনা। আমার স্ট্রলারর মধ্যে। আমার মনে আছে এটা এমনভাবে রেখেছিলাম পড়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। বা কেউ নেয়ারও কোনো কারণ নেই। তাছাড়া ততদিনে কোনো বোতলও হারায়নি।  খুব খুব খুব অবাক হলাম।

পাঁচ: অপার্থিব চলা

সেই দিনটি ছিলো সত্যি আলাদা। কারণ সেদিন যখন আমি ইনানী থেকে বের হই। তখনি ঠিক করি যে আজ আর নির্দিষ্ট গন্তব্য নয়। আজকের টার্গেট যতটা টেকনাফের কাছাকাছি যাওয়া যায়। আর পথে কোনো হোটলে মোটেল নয়। কোনো স্কুল বা মসজিদে থাকতে পারলেই হবে। মানে আজকের দিনটাই একমাত্র দিন যেদিন কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য ঠিক করা ছিলনা। রাত যখন সাড়ে দশটা তখন একটু পাহাড়ের ঢালে সেই নোয়াখালী বাজারে গিয়ে থামলাম। লোকেরা আমাকে দেখে অবাক হলো কিন্তু অবিশ্বাস করলোনা। অবাক বেশী হলো আমি একা একটা অচেনা ও নতুন এলাকায় রাতের বেলায় এভাবে জনবিরল জনপদের মধ্য দিয়ে আপন মনে নির্ধিধায় হেঁটে চলেছি সেজন্য। আর হাজার কিলোমিটার পথ পাঁয়ে হেটে পাড়ি দেয়ার পাগলামি করছি সেটাতো আছেই।

রাতে আমি একা সমুদ্রে হাটতে যেতে চাইলাম। ততক্ষণে চাদঁও উঠেছে। পাহাড়ের গা গলে নেমেছে চাঁদের আলো। সুন্দর ছোট একটি গ্রাম তার পিঠ ঠেকে দিয়ে সমুদ্রের গায়ে হেলে আছে। তার সমানে সমুদ্রআছড়ে পড়ছে সমুদ্রের ঢেউ আর ফেনা গলানো কোমল নোনা জলরাশি। তাতে কুয়াশা কুয়াশা হালকা জ্যোৎস্না পড়ছে। যেন জ্যোৎস্না আর জল একে অপরের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে। এমন দৃশ্য সৈকতে দেখার সুযোগ জীবনে হয়তো বার বার হবে না। সেই সৈকতে দূর অজানা থেকে একজন মানুষ মধ্যরাতে বসে জীবনের হিসেব কষে চলেছে হয়তোবা। আমি ভেবেছি নি:সঙ্গভাবে এরকম মুহর্তে সমুদ্রপাড়ে হাঁটবো এক নেসর্গিক দৃশ্যের অবতারণা করে তার স্মৃতি বয়ে বেড়াবো জীবনভর। দৃশ্যপটটা এইরকম হবে বা আমি এমনটা কল্পনা করছিলাম কিন্তু এলাকার সাত আটজন যুবক সঙ্গী হলো। তাই তাদের সাথে তাদের মতো করে  সাগরের সৈকতে রাত দুপুরে লুঙ্গি পরে স্যান্ডেল পায়ে বাতাস খেতে গিয়েছিলাম। ওহ ভীষন ভালো লাগেলো সেদিন। ৩৭ কিলোমিটার হেটে যাওয়ার পর সাগর পাড়ে বসে রাতে সমুদ্রের ঢেউগোনা সে এক অন্যরকম দিন। দিন না বলে রাত বলা ভালো তখন রাতের প্রায় ১টা বেজে গিয়েছিলো। সাগরের উত্তাল আনন্দ আমার ৩৭ কিলোমিটারের ক্লান্তিকে হাওয়া দিলো’’ করে দিলো। সমূদ্রের জল এসে রাতের আধাঁর কণার ফাঁকে জোসনার পলকে ছুঁয়ে যায় আমার অবিশ্রান্ত পদযুগল।

 

 

মন্তব্য
Loading...