কুমিল্লার দর্শনীয় স্থানসমূহ

0 179

কুমিল্লা ভ্রমণ নিয়ে আজ আমাদের ২য় পর্ব। প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা কুমিল্লায় ঘুরে বেড়াতে সবচেয়ে ভালো লাগবে তাদের যারা নৃতত্ব, প্রত্নতত্ত্বে আগ্রহী। ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করতে ভালোবাসেন যারা তাদেরও ভালো লাগবে। তবে এখানকার পর্যটকদের মাঝে অধিকাংশই এর কোনো ধরণের পড়াশোনার সাথেই যুক্ত নন। তারা আসেন কৌতুহল বশত। জায়গাগুলোকে কেন্দ্র করে আরও সহজবোধ্য আয়োজন করা গেলে সবার জন্যই ইতিহাসটা বোধগম্য হবে। আমাদের যাদুঘরগুলোতে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন শুধু সাজিয়ে রাখা হয় আর কিছু বর্ননা লেখা থাকে যা পড়তে আগ্রহ পায় না কেউই। বেড়াতে যেয়ে শ’খানেক খটমট ভাষার বর্ননা পড়তে ভালো লাগার কোথাও নয়।

পাশের দেশ ইন্ডিয়াসহ অনেক দেশেই যাদুঘরের এই ধারণা বদলে গেছে। সেখানে ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে ইতিহাস দেখানো হয়। এমন মিউজিয়ামও আছে যেখানে প্রশ্ন করলে রোবট উত্তর দেয়! ঘটনা দেখানো হয় হলোগ্রাফিক ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে। এসব উন্নয়নের কথা পর্যটন কর্পোরেশনকে এখন ভাবতে হবে। যুগ এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা নিজেদের ডিজিটাল বাংলাদেশ বলে দাবি করছি। ডিজিটালাইজেশন তো এখানেও হতে হবে তাই না? আর এসব ইতিহাস এখনই এভাবে আর্কাইভ করতে শুরু না করলে আমরা আরও অনেক কিছুই হারাব।

ইটখোলা মুড়া ও রূপবান মুড়া

বার্ড থেকে ঘুরে প্রশান্ত মনে এগিয়ে যান সামনের দিকে। পশ্চিম দিকে যাবেন। দেখবেন সাইনবোর্ডে লেখা আছে ইটখোলা মুড়ার কথা। এখানে একটি প্রাচীন বিহার আছে। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার অংশ কুমিল্লার বিভিন্ন বিহারের মধ্যে এটি একটি। বিহারে ধ্যানমগ্ন মূর্তিটি এক অন্যরকম ভালো লাগা তৈরি করবে আপনার মনে। ইটখোলা মুড়ার দক্ষিণে কালিবাজার সড়কের ওপারে রূপবান মুড়া। এটি একটি টিলার ওপর অবস্থিত যা সড়ক থেকে ১১ মিটার উঁচুতে। অষ্টম শতাব্দীর মন্দির এবং বিহারের চিহ্ন আজও বহন করছে এই জায়গাটি।

শাহ সুজা মসজিদ

সাড়ে তিনশ’ বছরেরও পুরাতন একটি মসজিদ শাহ সুজা মসজিদ। উপমহাদেশের প্রাচীন মসজিদগুলোর মাঝে অন্যতম এটি। ধারণা করা হয়, মসজিদের নির্মাণকাল ১৬৫৮ সাল। ধর্মীয় এই স্থাপনাটি সেই সময়ের স্থাপনা শৈলী, ঐতিহ্য এবং ইতিহাসকে ধারণ করছে।

অবস্থানঃ কুমিল্লার মুঘলটুলিতে অবস্থান এই মসজিদের। কান্দিরপাড় থেকে অটোরিকশা করে যেতে পারবেন এখানে। শাহ সুজা মসজিদ বললেই হবে। মসজিদ দেখে ঘুরে আসতে পারেন গোমতী নদীর তীরে।

শালবন বৌদ্ধ বিহার

বাংলাদেশের সভ্যতার প্রাচীনতম নিদর্শনগুলোর একটি হলো শালবন বৌদ্ধ বিহার। লালমাই-ময়নামতি প্রত্নস্থলের অসংখ্য প্রাচীন স্থাপনাগুলোর একটি এটি। সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতকের বৌদ্ধ বিহার কেমন ছিল দেখতে হলে যেতে হবে এখানে। তাদের নির্মাণ শৈলী, পরিকল্পনার ধরণ, স্থাপত্য কৌশল আপনাকে অবাক করে দেবে। তবে মনোযোগ দিয়ে দেখতে হবে আর দেখার আগে একটু পড়াশোনা করে নিতে হবে। শুধু স্থাপত্য নয়, এই বিহার সমৃদ্ধ ছিল সম্পদেও। এখানে পাওয়া গেছে আটটি তাম্রলিপি, ৪০০টি স্বর্ণ ও রৌপ্য মূদ্রা, অসংখ্য পোড়া মাটির ফলক, চমৎকার সব টেরাকোটা, সিলমোহর, ব্রোঞ্জ ও মাটির মূর্তি।

অবস্থানঃ কুমিল্লা কোটবাড়ি থেকে সিএনজি বা অটো রিকশায় যেতে পারবেন শালবন বিহার। বিহারে যাবেন বললেই হবে।পবেশ মূল্য ২০ টাকা।

ময়নামতি জাদুঘর

কুমিল্লার মূল খ্যাতি বা সবচেয়ে আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থানের একটি এই যাদুঘর। এখানে দেখতে পাবেন অষ্টম শতাব্দীর শ্রী ভবদেব মহাবিহার, রানীর বাংলো মহাবিহার, কোটিলা মুড়া, চাপত্র মুড়া, রূপবান মুড়া, ইটখোলা মুড়া, আনন্দবিহার, রাণীর বাংলো ও ভোজ রাঙ্গার বাড়ি থেকে উদ্ধার করা নানান মূল্যবান পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন। ব্রঞ্জ আর পাথরের মূর্তি, অলংকারের ভাঙ্গা অংশ, প্রাচীন মুদ্রা, পোড়া মাটির ফলক এই সব কিছুই প্রতিনিধিত্ব করছে সেই প্রাচীন সময়ের যা অনেক আগেই মিশে গেছে মাটির নিচে। ম্যাপ তৈরি করে দেখানো হয়েছে ভাঙ্গা স্থাপনাগুলো কেমন ছিল দেখতে, কোথায় ছিল ইত্যাদি। নিদর্শনগুলোর মধ্যে আকর্ষনীয় একটি হলো ৫শ’ কেজি ওজনের বিশাল ঘন্টা।

অবস্থানঃ শালবন বিহারের পাশেই ময়নামতি যাদুঘর। প্রবেশমূল্য ১০ টাকা।

ময়নামতি লালমাই লেকল্যান্ড

নাম লেক হলেও এটি কোনো জলাশয় নয়। বরং একে সবুজের লেক বলা যেতে পারে। ঘাসে ঢাকা পাহাড়ি এলাকার একটি অংশকে নিয়ে বিনোদনের আয়োজন করা হয়েছে এখানে। পাহাড়কে ঘিরে আছে ট্রেন রাইডের ব্যবস্থা। পশু পাখির নানান ধরণের প্রতিকৃতি জায়গাটির শোভা বাড়িয়েছে। তবে এখানকার প্রকৃতির সৌন্দর্য্যই মনকে আনন্দ দিতে যথেষ্ট।

অবস্থানঃ লালমাই পাহাড়। কুমিল্লার পাদুয়ার বাজার বিশ্বরোড  চৌমুহনীর দক্ষিণ দিক থেকে সিএনজিতে উঠতে হবে। লেকল্যান্ডে নামিয়ে দেবে।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্লু ওয়াটার পার্ক

বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বেড়ানোর জায়গা নয়। তবে একটি স্থানের বিশ্ববিদ্যালয় সেই স্থানের গৌরব। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থা, শিক্ষার্থীদের আচরণ, চারপাশের পরিবেশ প্রতিনিধিত্ব করে এলাকার সংস্কৃতির। ৫০ একর জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ও তাই দেখে আসতে পারেন। একে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে ব্লু ওয়াটার পার্ক। যেতে পারেন এখানেও।

অবস্থানঃ শালবন বিহারের কাছে। বিহার দেখে হেঁটে বা রিকশা-সিএনজিতে যেতে পারবেন এখানে।

গোমতী নদী

ভ্রমণের পরিপূর্ণ প্রশান্তি যেন নৌবিহারে। গোমতী নদীর তীরে একটি বিকেল ঘুরে বেড়াতে খুব ভালো লাগবে। শহর থেকে একটু দূরে নদী। নদীর উপর নির্মিত হয়েছে গোমতী সেতু। সেতুকে কেন্দ্র করে একটি ছোট পার্কও আছে এখানে। এ যেন স্বাধীনমনে বন্ধুত্ব উদযাপনের জন্যই তৈরি একটি জায়গা।

অবস্থানঃ কুমিল্লার কান্দির পাড় পূবালী চত্বর থেকে ৫০ মিটার পূর্ব দিকে আছে একটি চৌমুহনী। এখান থেকে রিক্সা নিয়ে যেতে হবে। শহর থেকে বাইরে বলে পরিবেশ আরও বেশি ভালো লাগবে।


গুগল ম্যাপে কুমিল্লার অবস্থান।

কুমিলা যাবেন যেভাবেঃ 

ঢাকার যাত্রাবাড়ি থেকে যেতে চাইলে এশিয়া ট্রান্সপোর্ট, এশিয়া লাইন বা তিশা ট্রান্সপোর্ট এর বাসে উঠুন। কমলাপুর থেকে যেতে চাইলে রয়েল কোচে উঠুন। এছাড়াও কুমিল্লার অনেক লোকাল বাস পাবেন। তবে সিটিং বাসে ওঠাই ভালো। নামবেন কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে।

আপনি যদি চট্টগ্রামবাসী হন তাহলে আপনার জন্য আছে সৌদিয়া ট্রান্সপোর্ট। এটি কুমিল্লার পাদুয়ার বাজার বিশ্বরোড দিয়ে জাঙ্গালিয়া নামিয়ে দেবে। জাঙ্গালিয়া থেকে অটোতে টমটম ব্রিজ। সেক্ষেত্রে ভ্রমণ পরিকল্পনা সাজান এভাবে- ফান টাউন, তারপর ইকো পার্ক, ধর্ম সাগর, সবুজ অরণ্য পার্ক, গোমতী এবং এখান থেকে অন্যান্য।

ট্রেনে কুমিল্লা যেতে চাইলে বিষয়টি আরও সহজ। ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, নোয়াখালী ইত্যাদি সকল জায়গা থেকে কুমিল্লার ট্রেন আছে। কুমিল্লা এসে আপনাকে অটোরিকশা বা রিকশা করে যেতে হবে কান্দিরপাড়। এখান থেকে অন্যান্য জায়গায় যেতে পারবেন সহজেই।

এছাড়াও লতিকোট মুড়া, কর্নেলের মুড়া, আনন্দবিহার, কোটিলা মুড়া, চারপত্র মুড়া, বৈরাগী মুড়া, বালাগাজীর মুড়া, চন্ডী মুড়া, ছিলা মুড়া, হাতিগাড়া মুড়া, পাক্কা মুড়া, উজিরপুর টিলা, রূপবানী মুড়া, কোটবাড়ি মুড়া, ভোজ রাজার বিহার, সতেররত্ন মন্দির, চিতোড্ডা মসজিদ, অর্জুনতলা মসজিদসহ আরও অনেক প্রাচীন নিদর্শন আছে এখানে। জায়গাগুলো কাছাকাছি। তাই স্থানীয়দের কাছে খোঁজ নিয়ে সহজেই ঘুরে আসতে পারবেন। বিশেষ করে শিশুদের জন্য কাজে দেবে আপনার কুমিল্লা ভ্রমণ। শুচেচ্ছা।

মন্তব্য
Loading...