একটি ছবির গল্প: জাহাঙ্গীর আলম শোভন

0 69

একটি ছবির গল্প: জাহাঙ্গীর আলম শোভন
কক্সবাজার থেকে তখনো ৫০ কিলোমিটার দূরে রয়েছি। বন বাদাড়ের ভেতর দিয়ে পথ চলছি। পায়ে হেঁটে যখন তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ যেতে হবে তখন তো এছাড়া আর কোনো গতি নেই। এই সফরতো এজন্যই মানুষ দেখবো মানুষের জীবন দেখবো দেখবো বিভিন্ন এলাকার ভিন্ন ভিন্ন কিছু ব্যাপার। কিন্তু কখনো কখনো অনেক কিছুতেই চোখে জল এসে গিয়েছিলো। প্রান্তিক মানুষদের কষ্টগুলো সত্যি পীড়া দেয়।

কর্তার নাম শাহ আলম। কথায় কথায় চার সন্তানের মাকে বেদড়ক মারধর করেন। অতীষ্ট হয়ে মা আজ চললেন অজানার উদ্দেশ্যে। বড় দুটি শিশু কান্না করতে করতে মায়ের পিছু নিয়েছে। মাকে ওরা যত জড়িয়ে ধরে মা ওদেরকে মৃদু প্রহার করে কাঁদতে কাঁদতে সামনে চলে যায়। মাইর খেতে খেতে তার সমস্ত শরীর বিষ হয়ে গেছে। আর সয়না যাতনা। এটাই মায়ের ভাষ্য। বয়স চল্লিশের ভেতরেই হবে কারণ বড়ো মেয়েটার বয়স দশ এগারো। দেখে মনে হয় আইবুড়ো। সংসারের গ্লানি, খাওয়া না খাওয়ার দিন আর কথায় কথায় মারের ফলে এমন হয়েছে।

শেষে আমি এগিয়ে আসলাম। এগিয়ে এলো প্রতিবেশী মহিলারা। মাকে বুঝিয়ে ঘরে নিয়ে যেতে সক্ষম হলো তারা। তবুও তিনি মানছেন না। বাচ্চাগুলো অনবরত কাঁদছিলো। আর কর্তামশাই ঘরে বসে ঘোৎ ঘোৎ করছিলো। রাগে অভিমানে যদিও যাওয়ার পথ ধরেছেন। হয়তো সবাই জানে এই মায়ের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। এই বয়সে কেউ তার দায়িত্ব নেবেনা। বাপের বাড়ীর অবস্থা হয়তোবা আরো খারাপ। নিজে কিছু করে খাবেন তাতেও সমস্যা আছে ন্যায্য পাওনা পাবেন না। আর কোনো অভিভাববক না থাকলে সামাজিক নিরাপত্তাটুকুও জুটবেনা। আর এটা ভালো করে জানে ওই বেটা আর জানে বলেই এভাবে মারতে পারে। আমার বউ আমি মারবো তুমি বলার কে? ভাবখানা এমন যেন বউ রাজ্যের রাজা। এই ধারণা অনেক শিক্ষিত লোকের মধ্যেও আছে।  কোনো নারীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে তাকে মারার অধিকার পাওয়া যায়। এই ধারণাটুকু আমরা সমাজ থেকে মুছতে পারিনি।

এখানে আরেকটি সমস্যা হলো বনের মাঝে বসতি করা এই লোকগুলোর বেশীরভাগ আরাকান থেকে আসা বৌদ্ধ মগদের অত্যাচার নির্যাতন আর জমি, ধান কেড়ে নিয়ে, নগদ টাকা লুট করে, বাড়ী ঘর জ্বালিয়ে দিয়ে তারপর ওরা শুরু করে নানা পাশাবিক নির্যাতন। এর ফলে লোকগুলো প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে চলে এসেছে চিরদিনের জন্য।
কিন্তু এভাবে আর কতকাল। সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে অসহায় নারীরা আর কতো নির্যাতন সইবে? ঘটনা চকরিয়া থেকে ঈদগা যাওয়ার পথে গতকাল ২৩ মার্চ। গ্রামের নামটা আমি স্পষ্ট বুঝতে পারিনি। তবে ৫০ কিলোমিটার ফলকের একেবারে গোড়ায় বলা যায়।

একটা কথা সবাইকে মনে রাখার উচিত। আমি স্বামী হয়ে যদি স্ত্রীর গায়ে হাত তুলি। তাহলে আমি নিজের দিকেই তীর তাক করলাম। যদি আমি আমার মাকে ভালোবেসে থাকি। তাহলে আমার স্ত্রী আমার সন্তানের মা। আমার সন্তানও তার মাকে ভালোবাসে ও সম্মান করে। আমি যখন তার সম্মানের জায়গাতে আঘাত করবো তখন আমার সন্তান আমার প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলবে, সে জীবনের প্রতি বিশ্বাস হারাবে, তার স্বপ্ন দেখা বন্ধ হবে। এবং একসময় বিদ্রোহী হয়ে সে নিজে বিদ্রোহী হতে পারে এবং তার স্ত্রীর সাথে সে একই আচরণ করতে পারে।
সূতরাং সব বিবেচনা থেকে এসব বিষয়ে সচেতন হওয়া দরকার।

মন্তব্য
Loading...